কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি :
বাল্যবিয়ে হচ্ছে বিদ্যালয়ের নাকের ডগায়, অথচ খবর নেই শিক্ষকদের! উল্টো সহপাঠীর বিয়েতে যাওয়ার অনুমতি নিয়ে হাজির ৩২ ছাত্রী। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ভেস্তে যায় বিয়ের আয়োজন। মেয়ের বাবার কাছ থেকে নেওয়া হয় মুচলেকা, করা হয় ১০ হাজার টাকা জরিমানা। আর ঘটনার দায়-দায়িত্ব নিয়ে এখন জবাবদিহিতার মুখে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রীর বিয়ের আয়োজনকে ঘিরে এ ঘটনা ঘটে। বিদ্যালয় থেকে বিয়ের স্থানটির দূরত্ব মাত্র ৫০০ গজ বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, দশম শ্রেণির ওই ছাত্রীর বিয়েতে অংশ নিতে একই শ্রেণির ৩২ ছাত্রী বিদ্যালয় থেকে বের হয়। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দীন বলেন, “ছাত্রীরা বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছে।” ওই ছাত্রী বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়ে কি না জানতে চাইলে তিনি তা স্বীকার করেন।
তবে বিয়েটি বাল্যবিয়ে কি না কিংবা তা বন্ধে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, “না, আমরা কোনো পদক্ষেপ নিইনি।”
শিক্ষার্থীদের বিয়েতে যাওয়ার অনুমতির বিষয়ে তিনি জানান, দুজন ছাত্রী বিদ্যালয়ে এসে অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল।
আরও প্রশ্ন ওঠে, বিয়ের খবর জানার পরও কেন প্রশাসনকে জানানো হলো না। বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক রওশনারা খাতুন বলেন, “বিয়ে হচ্ছে আমরা শুনেছি।” বিষয়টি কাউকে জানানো হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তার সরাসরি উত্তর, “আমরা কাউকে ইনফরমেশন করিনি।”
অর্থাৎ বিয়ের আয়োজনের খবর বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানতেন, শিক্ষার্থীরা সেখানে যাচ্ছিল, অথচ প্রশাসনের কাছে বিষয়টি পৌঁছায়নি। পরে প্রশাসনের কাছে খবর পৌঁছালে ঘটনাস্থলে গিয়ে বাল্যবিয়ের আয়োজনের সত্যতা মেলে।

খবর পেয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানিয়া আক্তার, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অর্না চক্রবর্তী, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিয়ের আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ সময় মেয়ের বাবার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়ার পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমের সময় কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাল্যবিয়ের আয়োজন বন্ধ হওয়ার পর বিষয়টি গড়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জবাবদিহিতায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয় এবং লিখিত জবাব চাওয়া হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দীন বলেন, “যেহেতু শিক্ষা অফিসার আমাদের ডেকেছেন এবং ইউএনও মহোদয় বিষয়টি অবহিত হয়েছেন, এই কারণে আমাদের কিছু বলার নেই। ওনারা যে পদক্ষেপ নেন আমরা তা মেনে নেব।”
উপজেলা শিক্ষা অফিসার জয়নাল আবেদীন বলেন, “শিক্ষকদের নিয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে আমরা বসেছি। ইউএনও মহোদয় লিখিত জবাব দিতে বলেছেন, তাঁরা লিখিত জবাব দেবেন।”
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিদ্যালয় থেকে মাত্র ৫০০ গজ দূরে একটি ছাত্রীকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে সেখানে যাচ্ছে, শিক্ষকরা বিষয়টি জানছেন, অথচ প্রশাসনকে জানানো হলো না কেন?
আরও বড় প্রশ্ন, শিক্ষার্থীদের বাল্যবিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখন লিখিত জবাব ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু বিয়ে বন্ধ করেই বিষয়টি শেষ না করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যথাযথভাবে যাচাই করা হোক।


