নিজস্ব প্রতিবেদক, কালিগঞ্জ :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে ঘের ব্যবসায়ী সঞ্জিব কুমার সরকার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তের মোড় এখন গোয়েন্দা নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে। নিছক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের আড়ালে এটি কি কোনো পরিকল্পিত ‘কিলিং মিশন’, নাকি পারিবারিক কলহের মোড়কে সাজানো গভীর কোনো ষড়যন্ত্র? মামলার এজাহারভুক্ত ৪ আসামির মধ্যে কেবল নেপাল চন্দ্র সরকার পুলিশের জালে আটকা পড়ায় এই প্রশ্নটি এখন কালিগঞ্জ জুড়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যঅনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখন ‘ক্রিটিক্যাল পয়েন্ট’ ও ‘গোয়েন্দা ধাঁধার’ সামনে । একের পর এক প্রশ্ন
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে আলামত নষ্ট করার যে অপচেষ্টা হয়েছে, তা পেশাদার অপরাধীদের কাজের ধরনকে ইঙ্গিত করে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন খতিয়ে দেখছে-হত্যাকাণ্ডের পর ঠিক কত দ্রুত আলামত সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং সেই ‘ক্লিনআপ’ প্রক্রিয়ায় কারা সরাসরি যুক্ত ছিল? কেন অপরাধীরা একটি সাধারণ জমিজমা বিরোধকে এতটা নৃশংসভাবে চূড়ান্ত পরিণতি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অভিযুক্তদের ভারত সংযোগ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মূল অভিযুক্তদের সেখানে বাড়ি ও সরকারি চাকরির সুযোগ রয়েছে। গোয়েন্দারা এখন গুরুত্বের সাথে দেখছেন, এটি কি কোনো ‘ক্রস-বর্ডার এস্কেপ প্ল্যান’? অপরাধীরা কি দেশ ছাড়ার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং সীমান্তে তাদের কোনো গোপন করিডোর ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক তল্লাশি চলছে।
ঘটনার ১৫-২০ দিন আগে ইউপি সদস্যের মধ্যস্থতায় যে সালিশ হয়েছিল, সেটি কি ছিল অপরাধীদের জন্য শেষ মুহূর্তের কোনো আল্টিমেটাম? কেন সালিশের ঠিক পরদিনই হত্যার হুমকি দেওয়া হলো? গোয়েন্দা অনুসন্ধানে এটি স্পষ্ট করার চেষ্টা চলছে-ওই সালিশ বৈঠকটি কোনো সমঝোতার মঞ্চ ছিল, নাকি অপরাধীদের চূড়ান্ত আক্রমণের আগে প্রতিপক্ষের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করার একটি ‘ইন্টেলিজেন্স গ্যাদারিং’ ছিল?
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো-নিহতের নিকটাত্মীয় কাকা ও ভাইদের সম্পৃক্ততা। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার নেপথ্যে থাকা কুচক্রী মহল মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে দৌড়ঝাপ শুরু করেছে। গোয়েন্দারা এখন ফোন ট্র্যাকিং এবং গত ১৫ দিনের আর্থিক লেনদেনের তথ্যের দিকে নজর দিয়েছেন। এই ‘পারিবারিক ষড়যন্ত্রের’ জালে আর কারা কারা জড়িত, সেটি উদঘাটনই এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য।
কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, “আমরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে দেখছি। গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হত্যার নেপথ্যে থাকা শক্তির উৎস যেখানেই থাকুক, তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে। আলামত ও প্রযুক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা খুব দ্রুত পুরো ‘ব্লু-প্রিন্ট’ উন্মোচন করতে সক্ষম হবো।”
দশ মাসের কন্যাসন্তানের পিতাকে হারানো এই পরিবারের আর্তনাদ এখন কালিগঞ্জবাসীর কণ্ঠে। সাধারণ মানুষ এখন কেবল বিচারের দাবিতেই সোচ্চার নয়, বরং সেই কুচক্রী মহলটির মুখোশ খুলে দেখতে চায়-যারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে চাইছে।
তদন্ত এখন কোন দিকে মোড় নেবে? সেই ‘নাটের গুরুরা‘ কি শেষ পর্যন্ত পুলিশের নাগালের বাইরে থাকবে? কালিগঞ্জবাসী এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।

