
মোঃ ইশারাত আলী, কালিগঞ্জ থেকে :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার খাজাবাড়িয়া গ্রামে যাতায়াতের পথ নিয়ে যে বর্বরতা ঘটেছে, তা কেবল এক টুকরো জমি বা মাটির বিরোধ নয়; এটি স্থানীয় বিচারহীনতা ও ক্ষমতার দাপটের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। যেখানে খোদ জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে হওয়া ‘শান্তিচুক্তি’ বা শালিসনামাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বৃদ্ধ ও নারীদের ওপর চালানো হয়েছে মধ্যযুগীয় তান্ডব।
আমাদের হাতে আসা ২২ মে, ২০২৫ তারিখের একটি চাঞ্চল্যকর শালিসনামার কপি বলছে, মথুরেশপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাকিম ও স্থানীয় সদস্যদের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে একটি অঙ্গীকারনামা সই হয়েছিল। সেখানে অভিযুক্ত পক্ষ (মো: মনিরুল ইসলাম গং) অঙ্গীকার করেছিল তারা ভবিষ্যতে কোনো হামলা বা বিশৃঙ্খলা করবে না। কিন্তু ঠিক এক বছরের মাথায় আজ (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) সেই চুক্তির তোয়াক্কা না করে ধারালো অস্ত্র ও রড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলাকারীরা। প্রশ্ন উঠেছে-এই শালিসনামার কি তবে কোনো আইনি ভিত্তি নেই? কেন স্থানীয় সালিশি বোর্ড এই অঙ্গীকারের তদারকি করেনি?
হাসপাতালের বেডে যন্ত্রণায় কাতর ৬৪ বছর বয়সী মোকছেদ আলীর হাত ভেঙে গেছে এমন অভিযোগ, মাথায় গভীর ক্ষত। তার স্ত্রী আছিয়া খাতুনের পায়ে কোপ। তাদের অভিযোগের তীর প্রতিপক্ষের পরিবারের সদস্য মনিরুল ইসলামের দিকে। তিনি সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় তার পদমর্যাদার দাপট দেখিয়েই বিবাদীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, “মনিরুলের ইন্ধনেই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে।” একজন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের পথ বন্ধ করা এবং রক্তপাত ঘটানোর বিষয়টি জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের দাবী তার ছোট ভাই ইয়াসিন রহমানের সাথে তার ফোনকল বা ম্যাসেজের মাধ্যমে কি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল তা খতিয়ে দেখা এবং তদন্ত করে ডিপার্টমেন্টাল ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, ইতিপূর্বে চেয়ারম্যানের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও তারা কোনো স্থায়ী সমাধান পাননি। মঙ্গলবার সকালে যখন মোকছেদ আলী তার পরিবারের যাতায়াতের একমাত্র পথটি সংস্কার করতে যান, তখন তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই অতর্কিত হামলা করা হয়। যেখানে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা বিদ্যমান ছিল, সেখানে প্রশাসন বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্লিপ্ততা হামলাকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পরোক্ষ সাহস জুগিয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার পর মো: মোকছেদ আলী বাদী হয়ে কালিগঞ্জ থানায় ৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে আসামি করে একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন। এজাহারের প্রধান অভিযুক্তরা হলেন-আব্দুল বারী, ইয়াছিন রহমান, আব্দুস সালাম, হারুন, আব্দুল্লাহ, শফিকুল ও স্বাধীন।
কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুয়েল হোসেন তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও ভুক্তভোগীদের মনে সংশয়-প্রভাবশালী মহলের চাপে এই মামলা কি কেবল নথিবদ্ধ ফাইল হিসেবেই থেকে যাবে?
কালিগঞ্জের খাজাবাড়িয়া গ্রামের এই রক্তপাত প্রমাণ করে যে, গ্রামীণ জনপদে বিচার ব্যবস্থা অনেক সময় প্রভাবশালীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। শান্তিচুক্তির দলিল যেখানে ছিঁড়ে রক্ত ঝরানো হয়, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ বড় প্রশ্নবিদ্ধ। কেবল একটি মামলা গ্রহণ নয়, বরং হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং ভুক্তভোগীদের যাতায়াতের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।



