মোঃ ইশারাত আলী :
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক ঘোষণা-আগামী ১০ দিন ইরানে কোনো একতরফা হামলা চালাবে না আমেরিকা। একদিকে ওয়াশিংটনের এই তথাকথিত 'শান্তি প্রস্তাব' আর অন্যদিকে তেহরানের রণপ্রস্তুতি-এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বিশ্ব এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই ১০ দিন কি সত্যিই যুদ্ধের বিরতি, নাকি ইরানকে কোণঠাসা করার কোনো নতুন ফাঁদ? আমেরিকা হামলা না করলেও ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? আর এই স্নায়ুযুদ্ধে চীন-রাশিয়াই বা কার পাল্লা ভারী করছে? আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে থাকছে এর গভীর বিশ্লেষণ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৬ এপ্রিল ২০২৬ রাত ৮টা পর্যন্ত ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা না করার যে ঘোষণা দিয়েছেন, একে সামরিক বিশেষজ্ঞরা 'কৌশলগত বিরতি' হিসেবে দেখছেন।
কেন এই বিরতি? পাকিস্তান ও তুরস্কের মাধ্যমে একটি ১৫-দফা শান্তি প্রস্তাব ইরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করছেন আলোচনা "খুব ভালো চলছে", যদিও ইরান একে "একপেশে ও অন্যায্য" বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গ্যারান্টি কী? ১০ দিন পর যে হামলা হবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বরং পেন্টাগন এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বেশি মেরিন সেনা এবং প্যারাট্রুপার মোতায়েন করছে। এটি স্পষ্টত একটি আলটিমেটাম-হয় প্রস্তাব মানো, নয়তো ধ্বংসাত্মক হামলার জন্য প্রস্তুত থাকো।
আমেরিকা জ্বালানি খাতে হামলার ক্ষেত্রে ১০ দিনের বিরতি দিলেও ইসরায়েল থেমে নেই। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) ইতিমধ্যে তেহরানের মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্র এবং মাশহাদ এলাকায় বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ইরানের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের টার্গেট করা। আমেরিকার ১০ দিনের 'পজ' কেবল বড় অবকাঠামোর জন্য; গোপন অপারেশন বা টার্গেটেড কিলিং (যেমন সম্প্রতি ইরানি নৌ-প্রধানকে হত্যা) ইসরায়েল চালিয়ে যেতে পারে।
ইরান গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটে থাকলেও তারা 'বসে থাকা'র পাত্র নয়।
সামরিক প্রস্তুতি: ইরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো ভূগর্ভস্থ 'মিসাইল সিটি'তে সরিয়ে নিচ্ছে এবং হুতি ও হিজবুল্লাহর মাধ্যমে পাল্টাহামলার ছক কষছে।
কৌশলগত চাল: ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে কেবল "অ-শত্রু" দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ফি আদায় করছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রাখার একটি বড় অস্ত্র।
নিউক্লিয়ার ডকট্রিন: ইরানের ভেতর থেকে এখন পারমাণবিক বোমা তৈরির এবং এনপিটি (NPT) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জোরালো দাবি উঠছে, যা তাদের শেষ আত্মরক্ষার কৌশল হতে পারে।
এই ত্রয়ী শক্তি সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও ইরানকে টিকিয়ে রাখতে পর্দার আড়াল থেকে কাজ করছে:
চীন: ইরান থেকে ৮০% তেল এখনো ডিসকাউন্টে কিনছে চীন, যা ইরানের অর্থনীতির লাইফলাইন। কূটনৈতিকভাবে তারা আমেরিকাকে "আগ্রাসনকারী" হিসেবে চিহ্নিত করছে।
রাশিয়া: ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের ড্রোন ব্যবহারের প্রতিদান হিসেবে রাশিয়া ইরানকে উন্নত রাডার এবং গোয়েন্দা তথ্য (Intelligence) দিয়ে সাহায্য করছে যাতে মার্কিন স্টিলথ বিমান শনাক্ত করা সহজ হয়।
উত্তর কোরিয়া: গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া ইরানকে নতুন প্রযুক্তির মিসাইল ইঞ্জিন সরবরাহ করছে।
আরব দেশগুলো (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার) এখন "শাঁখের করাত" অবস্থায় আছে। তারা একদিকে আমেরিকার মিত্র, আবার অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি নাগালে। ইরান ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যদি কোনো আরব দেশের মাটি ব্যবহার করে আমেরিকা হামলা চালায়, তবে সেই দেশকেও শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে। একারণেই কাতার ও ওমান মধ্যস্থতার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে।
আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময়টি মূলত ' স্নায়ুযুদ্ধ' (War of Nerves)।
যদি ইরান ১৫-দফা প্রস্তাবের কিছু অংশ মেনে নিয়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়, তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে।
কিন্তু যদি ইরান অনড় থাকে, তবে ৬ এপ্রিলের পর ট্রাম্প সরাসরি ইরানের তেল শোধনাগার এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানতে পারেন, যা পুরো বিশ্বকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
এখন আপনি ঠিকই ধরেছেন, ১০ দিন পর যে হামলা হবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। এই ১০ দিন মূলত ট্রাম্পের একটি 'স্নায়ুযুদ্ধ'।
আমেরিকার গ্যারান্টি: ট্রাম্পের ইতিহাসে দেখা গেছে তিনি চুক্তিতে আসার জন্য সর্বোচ্চ চাপ (Maximum Pressure) প্রয়োগ করেন। ১০ দিন পর যদি ইরান এই ১৫ দফার অধিকাংশ না মানে, তবে ট্রাম্প হয়তো ঘোষণা করবেন যে "আমরা শান্তির সুযোগ দিয়েছিলাম, ইরান তা নেয়নি"-এই অজুহাতে বড় ধরনের হামলা শুরু হতে পারে।
ইরানের প্রস্তুতি: ইরান ইতিমধ্যে এই প্রস্তাবকে "আত্মসমর্পণের দলিল" বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা ১০ দিনের এই বিরতিকে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষা করার এবং পাল্টা হামলার ছক গোছানোর সময় হিসেবে ব্যবহার করছে।
রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা: রাশিয়া ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ইরানের পারমাণবিক বা তেল স্থাপনায় হামলা হলে তা বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। চীন গোপনে ইরানকে আশ্বাস দিয়েছে যে তারা তেলের বাজার ধরে রাখবে, যা ইরানকে সাহস দিচ্ছে।
আরব দেশগুলোর অবস্থান: সৌদি আরব এবং কাতার বর্তমানে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করছে। তারা চায় না তাদের মাটি ব্যবহার করে আমেরিকা হামলা চালাুক, কারণ সেক্ষেত্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি রিয়াদ বা দোহায় আঘাত হানবে।
সারকথা: এই ১০ দিন মূলত "ঝড়ের আগের শান্তি"। ১০ দিন পর আমেরিকা যদি হামলা চালায়, তবে ইরান তার 'সুইসাইড ড্রোন' এবং 'হাইপারসনিক মিসাইল' দিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের তেল স্থাপনাগুলো জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে।